বাংলাদেশে বর্তমানে সোনার হরিণ বিসিএস বা বিজেএস। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ স্নাতক বিসিএস এর জন্য আবেদন করেন, বিজেএস এর ক্ষেত্রে সেটা হাজারে। আবেদনকারীর বিপরীতে পদসংখ্যা হিসাব করলে প্রতিযোগীতাটা বিসিএস বা বিজেএস দুইটাতেই সমান। আরও অসংখ্য সরকারি চাকরী থাকলেও কেন এই দুইটা ক্যাডার সার্ভিস এর প্রতি এত আকর্ষণ আমাদের? সেটা নিয়েই এই লেখা
লেখা শুরু করার আগে একটা প্রশ্ন, আপনাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনটা সব থেকে বেশি প্রভাবান্বিত করে? অর্থ? ক্ষমতা? সম্মান? খ্যাতি? চ্যালেঞ্জ? নাকি নিরাপত্তা? উত্তরটা ভাবতে থাকেন। এর মধ্যে এই দুইটা ক্যাডার সার্ভিস এর ইতিহাস জেনে আসা যাক।
বিসিএসঃ বেসামরিক আমলাতন্ত্রের এই অংশটি একটি উপনিবেশিক উত্তরাধিকার। ব্রিটিশরা ভারতীয় সিভিল সার্ভিস (আইসিএস) এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শাসন করত এবং আইসিএসের বেশিরভাগ কর্মকর্তা ব্রিটিশ ছিলেন। এটি প্রারম্ভিক বিংশ শতাব্দীতে ছিল যে ভারতীয়রাও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করে এবং বেশিরভাগ ভারতীয়রা আইসিএস-তে এটি নির্মাণ করে। ১৯৪৭ সালে ভারতের বিভাজনে সেন্ট্রাল সুপেরিয়র সার্ভিসেস শব্দটিকে পাকিস্তানে ব্যবহার করা হতো এবং সর্ব-পাকিস্তান সার্ভিসের ধারণা অব্যাহত ছিল।
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (সংক্ষিপ্ত রুপ বিসিএস নামে সর্বাধিক পরিচিতি) হল বাংলাদেশ সরকারের সিভিল সার্ভিস। এটি প্রাক্তন সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস অব পাকিস্তান থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যা উপনিবেশিক শাসনামলের ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞী নিয়ন্ত্রিত ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের উত্তরসূরি ছিল।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের একটি আইন দ্বারা নবজাতক দেশের সরকার ব্যবস্থার উন্নয়নে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস গঠিত হয়। এর মূলনীতি ও পরিচালনা পরিষদ বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত হয়।
২০১৮ সালের ১৩ নভেম্বর পিএসসির সুপারিশক্রমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ইকোনমিক ক্যাডারকে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত করে গেজেট প্রকাশ করে। ফলে বিসিএস ক্যাডারের সংখ্যা ২৭টি থেকে কমে ২৬টি হয়। এর মধ্যে ১৪টি সাধারণ ক্যাডার এবং ১২ টি প্রফেশনাল ক্যাডার।
বিজেএসঃ ২০০৭ সালে ঐতিহাসিক মাজদার হোসেন কেস এর রায় এর মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ এর মাধ্যমে সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষা আলাদাভাবে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস নামে শুরু হয়। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের সরাসরি সহকারী জজ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
সরকারি চাকরীর ফার্স্ট ক্লাস চাকরী দুই ধরনের, ক্যাডার এবং নন ক্যাডার। ক্যাডার আর নন ক্যাডার জব এর মধ্যে মূল পার্থক্য হল, ক্যাডারগণ প্রমোশন পেয়ে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে যেতে পারেন,যা নন ক্যাডার গণ যেতে পারেন না। প্রায় সব ক্যাডারই কমপক্ষে সর্বচ্চো গ্রেড পর্যন্ত যেতে পারেন, অন্যদিকে নন ক্যাডারে বেশির ভাগ পদই ব্লক পোস্ট।
কেন বিসিএস/ বিজেএস এটার সব থেকে সহজ উত্তর হলো আমি এখানে উপরোক্ত সব কয়টাই পাচ্ছি। কি নেই এই সার্ভিস এ? অর্থ থেকে শুরু করে নিরাপত্তা পর্যন্ত সব কিছুই এখানে আছে। এক এক করে আসি।
বিসিএস এ মোট ২৬ টা ক্যাডার এর বেতন শুরু হয় ৯ম গ্রেড এ, এবং চাকরী শেষ হতে হতে সেটা গ্রেড ১ তো বটেই, কারো কারো ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ সচিব বা মূখ্য সচিব পর্যায়ের সমান হয়ে যায় যা যেকোনো সরকারী চাকরীর হিসাবে সর্বোচ্চ! বেতন এর সাথে এই সার্ভিসে অন্যান্য ভাতাও অন্য যেকোনো সরকারী চাকরী থেকে বেশি।
বিজেএস এ অর্থের পরিমাণ বিসিএস এর তুলনায় কম হলেও অনেক আকর্ষণীয়, বিশেষ করে চাকরীর শুরুতে ৩০,৯৩৫/- যেকোনো প্রবেশকারীর জন্য অনেক আকর্ষণীয়, যা পরবর্তীতে পোস্ট ও বয়সের সাথে সাথে প্রথম গ্রেডে শেষ হয়।
এগুলার সাথে বোনাস হিসেব থাকে ভাতাসমূহ, বাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে চিকিৎসা, শিক্ষা, গাড়িভাড়া পর্যন্ত ভাতার হিসেবে বেতন অনেক হয়ে যায়। সাথে দুই ঈদ, পুজায় ১০০% বোনাস এবং বৈশাখে ২০% তো আছেই!
সুতরাং যেকোনো সরকারি চাকরীর তুলনায় এই দুই ক্ষেত্রে অর্থের ঝনঝনানি অনেক বেশি। বেসরকারি চাকরীর সাথে তুলনা টা একটু পর আসব।
ক্ষমতার হিসাব করলে এই দুই সার্ভিস এর ক্যাডাররা ফার্স্ট ক্লাস গেজেটেড অফিসার। সিম্পল এটেস্টেশন থেকে শুরু করে ক্ষেত্র বিশেষ এ ম্যাজিস্ট্রেসি। গল্প শোনা যায় এই অফিসারদের জন্য সাধারণের জন্য নয় এমন সব কাজ খুবই স্বাভাবিক ও স্বাধারণভাবেই হয়ে যায়। সত্য বলতে ক্ষমতার বিষয়টা বর্ণনা করার থেকে দেখা যায় বেশি, আপনারা সবাই কমবেশি গল্প জানেন বা দেখেছেন। নিজের কর্মক্ষেত্রের যে কোনো জায়গায় অবাধ ক্ষমতা প্রদর্শনের এই জিনিসটাই মনে হয় মানুষকে সব থেকে বেশি আকর্ষণ করে। অন্য কোনো চাকরীতে এই ক্ষমতা তুলনা করতে গেলে নাই বললেই চলে!
এরপর আসে সম্মান, আপনি দেশের ফার্স্ট ক্লাস গেজেটেড অফিসার, আপনার সিনিয়র ছাড়া বাকি সবাই আপনাকে স্যার বলে ডাকবে(যদিও এটা নিয়ে এখন অনেকে বাড়াবাড়ি করে)। সাথে যেখানেই যাবেন আপনি দেশের সব থেকে প্রতিযোগীতামূলক জায়গায় টিকে গেছেন৷ এটার জন্যই আলাদা সম্মান, সরকারি চাকরিজীবি হিসেবে সম্মান, সব দিক দিয়েই আপনি সম্মানিত।
খ্যাতির ক্ষেত্রে আপনি দেশের সব থেকে প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। আর আগেই বললাম তো আমাদের দেশে এটা চাকরীর সর্বোচ্চ স্ট্যান্ডার্ড হয়ে গেছে। তাহলে বুঝুন আপনার এলাকায়, আপনার পরিচিত মহলে আপনার খ্যাতিটা কেমন হবে।
বিসিএস বা বিজেএস দুইটা সার্ভিসই অনেক চ্যালেঞ্জিং, কারণ দেশের যত মান্ধাত্তা আমলের সিস্টেম আর কঠিন কাজগুলোই করতে হবে আপনাকে।
আর সব শেষে আসি সরকারি চাকরীর সব থেকে আকর্ষণীয় বিষয়, চাকুরীর নিরাপত্তাটা, আপনার চাকুরী সহজে যাবে না, চাকুরী শেষে বড় অংকের পেনশন পাবেন, বেসরকারি চাকুরীতে এই নিরাপত্তাটা নাই।
আরও একটি বিষয় এখানে কাজ করে, সেটি হলো বিসিএস বা বিজেএস হলো ইজি মানির সেক্টর৷ একবার এখানে যেতে পারলেই আর চিন্তা থাকে না, প্রমোশন থেকে বেতন সব কিছুই টাইম্লি হবে। সাথে ব্যাক্তিগত গাড়ি ও বাংলোর সুবিধা তো আছেই। ক্ষেত্রবিশেষে পার্সোনাল গানম্যানও পাওয়া যায়।
বেসরকারি কোনো চাকুরীতে বেতন বা সুবিধাদি বেশি হলেও নিরাপত্তা থাকে না, চ্যালেঞ্জটা প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রমাণ করার, যুদ্ধের শামিল। কমপ্লিট প্যাকেজটা এই দুইটা সেক্টর বাদে অন্য কোনো চাকুরী সেটা সরকারি বা বেসরকারি কোনোটাতেই থাকে না। বেসরকারি ক্ষেত্রে নিজে উদ্যোক্তা হলেও ফ্যামিলি থেকে প্রোপার সাপোর্ট ছাড়া টিকে থাকা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং এবং কঠিন। উদ্যোক্তা হয়ে সফল হতে পারলে অবশ্য সেটা বিসিএস বা বিজেএস ক্যাডার হওয়ার থেকেও অনেক বেশি ভালো এবং প্রাপ্তির। যদিও পাড়ার চাচাকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন না। প্র্যাক্টিস লাইফ অনেকটা এই উদ্যোক্তা লাইফের মতোই।
এগুলো সব কিছুর সাথে যেটা সব থেকে বেশি কাজ করে সেটা হলো আমাদের আর্থ সামাজিক অবস্থা। আমাদের আর্থ সামাজিক অবস্থা এমন যা আমাদের এই বৃহৎ বেকার গোষ্ঠীকে উদ্যোক্তা হতে দেয় না, প্রায় সবারই পড়াশোনা শেষ হওয়ার পরই পরিবারের হাল ধরতে হয়, চ্যালেঞ্জিং পেশায় যা করা অনেক কঠিন। সেজন্য সহজ উপায় এই বিসিএস বা বিজেএস ক্যাডার হয়ে যাওয়া৷ এতো কমপ্লিট প্যাকেজ আর কোথায় আছে?
এক কথায় বিসিএস বা বিজেএস বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটা কমপ্লিট প্যাকেজ অফার করে যা অন্য কোনো ক্ষেত্রে পাওয়া এক রকম অসম্ভব! এজন্য বিসিএস ক্যাডার বা বিজেএস ক্যাডার এখন সোনার হরিণ।
তথ্যসূত্র -
উইকিপিডিয়া
দৈনিক সমকাল
লেখক -
কাজী মোহাম্মদ নোমান


Comments
Post a Comment